মানবিকতার অপমৃত্যু ও আমাদের স্থবির রাজনীতি
একটি নিথর দেহ, তিনটি বছরের একরাশ স্বপ্ন আর একজন বাবার বুকফাটা আর্তনাদ—এই চিত্রটি আজ কোনো কাল্পনিক গল্পের অংশ নয়, বরং আমাদের রূঢ় বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি। যে বয়সে একটি শিশুর হাতে থাকার কথা ছিল খেলনা, সেই বয়সে তার নিথর দেহটি ঠাঁই পেয়েছে বাবার কোলে। কামরাঙ্গীরচর থেকে মহাখালী—কিলোমিটারের পর কিলোমিটার তপ্ত পিচঢালা রাস্তায় এক অসহায় বাবার এই যে দৌড়, তা কেবল হাসপাতালের সন্ধানে ছিল না; তা ছিল আমাদের রাষ্ট্রব্যবস্থার রন্ধ্রে রন্ধ্রে জমে থাকা পচনের বিরুদ্ধে এক নীরব প্রতিবাদ।
অবহেলার খতিয়ান ও মৃত্যুর মিছিল
একটি স্বাধীন দেশে যখন হামের মতো প্রতিরোধযোগ্য রোগে ২৫৭ জন শিশুর প্রাণ যায় এবং ২৬ হাজার শিশু হাসপাতালে মৃত্যুর সাথে পাঞ্জা লড়ে, তখন বুঝতে হবে আমাদের স্বাস্থ্যখাত আজ আইসিইউতে। সুনামগঞ্জের সেই মায়ের কথা ভাবুন, যিনি সন্তানের জীবন বাঁচাতে নিজের শেষ সম্বল নাকের ফুলটি বিক্রি করে দিয়েছেন। অথচ সেই ত্যাগের বিনিময়ে রাষ্ট্র তাকে কী দিয়েছে? দিয়েছে একবুক শূন্যতা আর হাহাকার।
বিগত সরকারের রেখে যাওয়া ৪২ হাজার কোটি টাকার বরাদ্দ কোথায় হারালো? কেন আজও একজন ডাক্তারকে টিকার একটি চালানের জন্য অযোগ্য রাজনীতিবিদের দ্বারে দ্বারে ঘুরতে হয়? এর উত্তর খুঁজতে গেলে দেখা যায়:
- নীতিগত উদাসীনতা: স্বাস্থ্য উপদেষ্টার গাফিলতি এবং বর্তমান নীতিনির্ধারকদের অনীহা আজ হাজারো শিশুর জীবনকে ঝুঁকিতে ফেলেছে।
- আমলাতান্ত্রিক জটিলতা: উচ্চশিক্ষিত ডাক্তারদের মেধা আজ রাজনৈতিক সইয়ের কাছে জিম্মি।
- বৈষম্যের পাহাড়: সাধারণ মানুষের ট্যাক্সের টাকায় নেতাদের চিকিৎসা হয় ইউরোপ-আমেরিকায়, আর সাধারণ বাবারা মৃত সন্তান কোলে নিয়ে পথ হাঁটেন।
রাজনীতি বনাম সাধারণের জীবন
আমরা অনেকেই ভাবি "রাজনীতি দিয়ে আমাদের কী হবে?" কিন্তু বাস্তব হলো, আপনি রাজনীতি নিয়ে মাথা না ঘামালেও রাজনীতি আপনার বাচ্চার টিকার ফাইল নিয়ে ছিনিমিনি খেলছে। আপনার সুন্দর জীবনের স্বপ্ন আজ ক্ষমতাবানদের ড্রয়ারে বন্দি। স্বাধীনতার পর থেকে তেলের দাম বেড়েছে, চালের দাম বেড়েছে, নেতাদের জৌলুস বেড়েছে—কেবল বাড়েনি সাধারণ মানুষের প্রাণের দাম।
"রাজনীতিবিদদের কাছে আজ জনসেবার চেয়ে সংসদের গলাবাজি বড় হয়ে দাঁড়িয়েছে। ফলে হাসপাতালের করিডোরে টিকার অভাবে যখন একটি শিশু শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করে, তখন সেই দায়ভার নেওয়ার মতো মেরুদণ্ড কারো নেই।"
মৃত সন্তানকে কোলে নিয়ে সেই বাবার বাড়ি ফেরার দৃশ্যটি আমাদের সামগ্রিক ব্যর্থতার একটি স্মারক। ২৬ হাজার শিশু এখনো হাসপাতালে কাতরাচ্ছে। আমরা কি আরও হাজারো বাবার কান্নার অপেক্ষায় থাকব? যদি এখনই টিকার সংকট নিরসন এবং স্বাস্থ্যখাতে রাজনৈতিক খবরদারি বন্ধ না করা হয়, তবে এই দায় ইতিহাস কাউকে ক্ষমা করবে না। মানুষের জীবনের দাম যখন নেতার বিলাসের চেয়ে কম হয়, তখন সেই সমাজ আর যা-ই হোক, 'সভ্য' হওয়ার দাবি রাখতে পারে না।
আজকের এই হাহাকার কেবল এক বাবার নয়, এ হাহাকার একটি পঙ্গু রাষ্ট্রব্যবস্থার শিকার কোটি কোটি মানুষের।

0 মন্তব্যসমূহ